বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব: ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংবাদিকতা ও আগামীর প্রত্যয়
ভূমিকা
বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব বিয়ানীবাজারের সংবাদকর্মীদের অভিন্ন মঞ্চ। অভিজ্ঞতা, সততা ও পেশাদারিত্বের সম্মিলনে একটি স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল ও গণমুখী গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তোলাই এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য। স্থানীয় সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং গণমানুষের কথা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তুলে ধরার লক্ষ্যে প্রেসক্লাব দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব বিশ্বাস করে—সত্য, ন্যায় ও নিরপেক্ষতা সাংবাদিকতার প্রধান তিনটি স্তম্ভ। এই মূল্যবোধকে সামনে রেখে প্রতিটি সদস্যকে নৈতিক ও দায়িত্বশীল সংবাদ উপস্থাপনায় উদ্বুদ্ধ করা হয়। সমাজের স্বার্থে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা এবং সাংবাদিকতার মর্যাদা সমুন্নত রাখা এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম অঙ্গীকার।
ডিজিটাল যুগের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার এবং নতুন সাংবাদিকদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকেও প্রেসক্লাব গুরুত্ব দিয়ে দেখে। সংবাদ সংগ্রহ, সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ভিডিও সাংবাদিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নাগরিক অধিকার, তথ্য অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাও প্রেসক্লাবের দায়িত্বের অংশ। সমাজের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগকালীন ত্রাণ কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও এ প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ।
পঞ্চখণ্ডের প্রজ্ঞাধর্মী ইতিহাস
বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানীখ্যাত সিলেট—যার বুকে বয়ে চলেছে সুরমা, কুশিয়ারা ও সুনাই নদী। এই নদীবিধৌত জনপদেই গড়ে উঠেছে পঞ্চখণ্ড, অর্থাৎ বর্তমান বিয়ানীবাজার উপজেলা—এক গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক অঞ্চল।
ইতিহাসের পাতায় এ জনপদকে ‘ক্ষুদে নবদ্বীপ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে—জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির প্রতীক নবদ্বীপের নামানুসারে। শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে বিয়ানীবাজারের ঐতিহ্য তাই দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ।
পত্র-পত্রিকা ও আধুনিক সাহিত্যচর্চায় পঞ্চখণ্ডের অগ্রণী ভূমিকা
সিলেট অঞ্চলে আধুনিক সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার সূচনাতেও পঞ্চখণ্ডের সন্তানদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
১৮৭৪ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’-এর সম্পাদক ছিলেন শাহবাজপুর নিবাসী কবি ও সাংবাদিক প্যারিচরণ দাস। তাঁর জন্মস্থান বর্তমান বিয়ানীবাজারের জলঢুপ থানা এলাকায়।
নারী সাহিত্যচর্চার পথিকৃৎ কৃষ্ণপ্রিয়া চৌধুরাণী
সিলেটের ইতিহাসে প্রথম নারী কবি হিসেবে খ্যাত কৃষ্ণপ্রিয়া চৌধুরাণী ছিলেন জলঢুপ গ্রামের কৃতিসন্তান।
তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘নারীমঙ্গল’ প্রকাশিত হয় ১৮৯৪ সালে। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালে প্রকাশিত ‘সংহার পরিহার’ গ্রন্থে গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে নারীর চেতনা ও বেদনার কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নারীশিক্ষার প্রসারেও তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
উল্লেখযোগ্য সাহিত্যপ্রতিভা ও গ্রন্থসমূহ
প্রাক-ব্রিটিশ যুগ থেকে পাকিস্তান আমলের পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত বিয়ানীবাজারে যাঁরা সাহিত্যচর্চায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন—
১. পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি — জন্ম: খাসা পণ্ডিতপাড়া। গ্রন্থ: চিন্তামণি দীধিতি, প্রামাণ্যবাদ, পদার্থ রত্নমালা, ক্ষণভঙ্গুরবাদ ইত্যাদি।
২. মহেশ্বর ন্যায়লঙ্কার — জন্ম: সুপাতলা। গ্রন্থ: অষ্টবিংশতি প্রদীপ, ভাবার্থ চিন্তামণি ইত্যাদি।
৩. রামেন্দ্র ভট্টাচার্য্য — জন্ম: লাউতা। গ্রন্থ: মীরাবাঈ, রামপ্রসাদ ইত্যাদি।
৪. সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য — জন্ম: নয়াগ্রাম। গ্রন্থ: সমাজচিত্রে পঞ্চখণ্ড, আসামে মহাপ্লাবণ, India Under The British Crown।
৫. রামানন্দ মিশ্র — জন্ম: সুপাতলা। গ্রন্থ: রসত বিলাস।
৬. সত্যরাম — জন্ম: সুপাতলা। গ্রন্থ: ঘাটু সঙ্গীত, ধুয় বা ধুরা।
৭. সতীশচন্দ্র দেব — জন্ম: লাউতা। গ্রন্থ: নীতি সন্দর্ভ সংকলন।
এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, বিয়ানীবাজার শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি একটি প্রজ্ঞাধর্মী জনপদ, যেখান থেকে উপমহাদেশের ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহু বর্ণময় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
বিয়ানীবাজারে সাংবাদিকতার সূচনালগ্ন
এই সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতায় বিয়ানীবাজারে সাংবাদিকতার ইতিহাসও সামনে আসে।
বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতার বীজ রোপিত হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগেই। পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি, কৃষ্ণপ্রিয়া চৌধুরাণী, সতীশচন্দ্র দেব প্রমুখ মনীষী সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতায়ও অবদান রেখেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
সতীশচন্দ্র দেব, লাউতা গ্রামের প্রতিথযশা সাংবাদিক, ‘জন্মভূমি’ ও ‘শ্রীভূমি’ নামক দুটি ঐতিহাসিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
- ১৯২০ সালে সিলেট থেকে ‘জন্মভূমি’ প্রকাশিত হয় জাতীয়তাবাদী সাপ্তাহিক হিসেবে।
- ১৯২৬ সালে করিমগঞ্জ থেকে তাঁর সম্পাদনায় ‘শ্রীভূমি’ প্রকাশিত হয়।
- ক্ষিরোদচন্দ্র দেব ‘সুরমা’, ‘জনশক্তি’ ও ‘শ্রীভূমি’ পত্রিকায় কাজ করেছেন।
- পণ্ডিতপাড়া গ্রামের তুষারপণ্ডিত বিবিসির কলকাতা প্রতিনিধি এবং ভারতের একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক ছিলেন।
- কাকুরা গ্রামের রাধানাথ চৌধুরী ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ‘পরিদর্শক’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন।
বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা ও প্রেক্ষাপট
সাংবাদিকতা জাতির বিবেক—যা ইতিহাসকে ধারণ করে, সমাজকে জাগায়, রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে এবং মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের পথে আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে।
এই মহৎ পেশার একটি ঐতিহাসিক ঘাঁটি হিসেবে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের নাম উল্লেখযোগ্য। আপনার প্রদত্ত ইতিহাস অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের মফস্বল অঞ্চলের প্রথম প্রেসক্লাব হিসেবে পরিচিত।
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সংবাদপত্রের বিকাশ ও সমাজদর্শনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেই প্রতিষ্ঠানটির পথচলা শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠা: ১৯৮২ সাল
১৯৮২ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলামের হাত ধরে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
স্থানীয় সাংবাদিকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এ সংগঠনটি সময়ের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজও বিয়ানীবাজারের সংবাদজগতে তার ঐতিহ্য বহন করে চলছে।
১৯৮২ সাল থেকে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব
১৯৮২ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমবান্ধব ও পেশাদার নেতৃত্ব প্রেসক্লাবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ধারাবাহিক তালিকা
| সময়কাল | সভাপতি | সাধারণ সম্পাদক |
|---|---|---|
| ১৯৮২–১৯৮৩ | আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম | আব্দুর রউফ খান মিস্টু |
| ১৯৮৩–১৯৮৪ | আব্দুর রহীম | মোঃ মিছবাহ উদ্দিন |
| ১৯৮৫–১৯৮৭ | আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম | আব্দুল বাসিত |
| ১৯৮৯–১৯৯০ | আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম | ফারুক যোশী |
| ১৯৯১–১৯৯২ | আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম | মুস্তাফিজ শফি |
| ১৯৯২–১৯৯৩ | আব্দুর রহীম | আজিজুল পারভেজ |
| ১৯৯৪–১৯৯৫ | আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম | আব্দুর রহীম |
| ১৯৯৯–২০০০ | খালেদ সাইফুদ্দীন জাফরী | আলী আহমদ বেবুল |
| ২০০১–২০০৩ | খালেদ সাইফুদ্দীন জাফরী | ফজলুল হক |
| ২০০৩–২০০৫ | আব্দুর রহীম | মোঃ আতাউর রহমান |
| ২০০৫–২০১১ | আব্দুর রউফ খান মিস্টু | মোঃ আতাউর রহমান |
| ২০১২–২০২০ | মোঃ আতাউর রহমান | মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম |
| ২০২১–বর্তমান | সজীব ভট্টাচার্য | মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম |
এই তালিকাটি আপনার দেওয়া মূল তথ্য অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। মূল উৎসেও ১৯৮২–বর্তমান পর্যন্ত নেতৃত্বের এই ধারাবাহিকতা উল্লেখ রয়েছে।
ঐক্য, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতার বার্তা
প্রেসক্লাবের স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষায় মতান্তর থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে তা নিরসনের পথ খোলা রাখা প্রয়োজন।
একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সুস্পষ্ট বার্তা হতে পারে—
“কে ছোট সাংবাদিক, কে বড় সাংবাদিক—তা বিবেচ্য নয়; সবচেয়ে প্রয়োজন ঐক্য, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতার সুরক্ষা।”
চ্যালেঞ্জ ও বার্তা
বিভিন্ন সময়ে মতবিরোধ, আঞ্চলিকতা ও বিভাজনের কারণে প্রেসক্লাব সংকটে পড়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্য, স্বচ্ছতা ও সাংবাদিকতার মান।
প্রেসক্লাবকে ঘিরে মতান্তর থাকতেই পারে, কিন্তু মনান্তর থাকা উচিত নয়।
প্রশাসন, সাংবাদিক সমাজ ও জনসাধারণের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এবং প্রেসক্লাবের বৈধ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক ধারাবাহিকতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা সংশ্লিষ্ট সবার নৈতিক দায়িত্ব।
মুক্তিযুদ্ধ ও সাংবাদিকতা
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ‘মুক্তবাংলা’, ‘জয়বাংলা’, ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’, ‘জন্মভূমি’ প্রভৃতি পত্রিকা এ অঞ্চলের সাংবাদিকতার গৌরবময় ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
উল্লেখযোগ্য পত্রিকা ও সাংবাদিকদের ভূমিকা
সাপ্তাহিক মুক্তবাংলা
আসামের করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত এ পত্রিকার সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ছিলেন এইচ. সা’আদত খান (ছদ্মনাম: আবুল হাসনাত এ.এইচ.)। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম।
সাপ্তাহিক জয়বাংলা
সহকারী সম্পাদক: মোহাম্মদ আব্দুল বাসিত (ছোটদেশ)।
সোনার বাংলা
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোহাম্মদ আব্দুল বাসিত (ছোটদেশ)।
সাপ্তাহিক বাংলাদেশ
সম্পাদক: আব্দুল মতিন চৌধুরী (আলীনগর)।
জন্মভূমি
সম্পাদক: মোস্তফা আল্লামা (দেউলগ্রাম)।
জাতীয় পর্যায়ে বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকদের অবদান
জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতায় সুপ্রতিষ্ঠিত এবং বিয়ানীবাজারকে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম — দৈনিক আজাদ; মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তবাংলা সাপ্তাহিকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।
- আব্দুল হাকিম তাপাদার — আল-ইসলাহ।
- বোরহান উদ্দিন খান — সাবেক সভাপতি, সিলেট প্রেসক্লাব।
- মোহাম্মদ আব্দুল বাসিত — ইত্তেফাক প্রতিনিধি।
- বাহাউদ্দিন — শালেশ্বর গ্রামের; মর্নিং সান।
- লোকমান আহমদ — দৈনিক আজকের সিলেট সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি।
- এম. এ. তারিক — অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি; সাপ্তাহিক প্রহর সম্পাদক।
- ডা. নিবেদিতা দাস পুরকায়স্থ ও রাখি দাস পুরকায়স্থ — ‘চিহ্ন’ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ এবং ‘নন্দিনী মালিয়া’ ছদ্মনামে সংবাদে লেখালেখি।
এছাড়াও স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতার পরিচিতি ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছেন কবি শামসাদ হুসাম, শহীদুল ইসলাম, মুস্তাফিজ শফি, আজিজুল পারভেজ, রেজওয়ান আহমদ, শাহজাহান কমরসহ আরও অনেকে।
আশির দশকের সাংবাদিকরা
আশির দশকের প্রথমদিকে প্রেসক্লাবকেন্দ্রিক বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতায় যুক্ত হন—
আব্দুল হাছিব, আব্দুর রউফ খান মিস্টু, মিসবাহ উদ্দিন, রণজিৎ চক্রবর্তী, হেলাল উদ্দিন, আব্দুর রহীম, আব্দুল আজিজ, আলী ঈসমাইল, দেলোয়ার হোসেন জিলন, কবি ফজলুল হক, শাকুর মজিদ, খালেদ জাফরী প্রমুখ।
নব্বই ও পরবর্তী দশকের সাংবাদিকরা
নব্বই ও পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়া উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—
মুস্তাফিজ শফি, আজিজুল পারভেজ, আতাউর রহমান, বাবুল হোসেন, আব্দুল কাদির মুরাদ, আব্দুল্লাহ আল আনসারি, শাহজাহান কমর, আলী আহমদ বেবুল, জয়নাল আফসার, রেজওয়ান আহমদ, আব্দুর রহিম শামীম, আব্দুল খালিক, শরিফুল হক মঞ্জু, হিরন রোহী দাস, এম হাসানুল হক উজ্জ্বল, এম সাত্তার আজাদ, ফয়জুল হক শিমুল, সজীব ভট্টাচার্য, এম আনোয়ারুল ইসলাম অভি, মুকিত মুহাম্মদ, আব্দুল ওয়াদুদ, এনায়েত হোসেন সোহেল, শাহীন আলম হৃদয়, মিলাদ মো. জয়নুল ইসলাম, মোঃ জাকির হোসেন ও ছাদেক আহমদ আজাদ।
পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা
পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়েছেন—
হাসান শাহরিয়ার, শাবুল আহমদ, মাসুম আহমদ, মোঃ লুৎফর রহমান, মনোয়ার হুসেন লিটন, ফয়সল মাহমুদ, আহমেদ ফয়সাল, ফুজেল আহমদ, রাগিব মাজমুদ তাপাদার, জহির উদ্দিন, সুফিয়ান আহমদ, শিপার আহমদ পলাশ, এ টি এম আবু তুরাব, সুয়াইবুর রহমান স্বপন, মোঃ জসিম উদ্দিন, সামিয়ান হাসান, রেজাউল হক, তোফায়েল আহমদ, সৈয়দ মুনজের হোসেন বাবু, আহমদ রেজা চৌধুরী, এম এ ওমর, আবুল হাসান, শহিদুল ইসলাম সাজু, আমিনুল হক দিলু, মিসবাহ উদ্দিন, আহমদ মহসিন রনি, সাকের আহমদ, রুহেল আহমদ ও হাফিজুর রহমান তামিম প্রমুখ।
সময়ের স্রোতে অনেকে পেশা পরিবর্তন করেছেন, কেউ প্রবাসে গেছেন। তবে এখনো অনেকে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও স্থানীয় সংবাদপত্রের ধারাকে এগিয়ে নিচ্ছেন এবং নতুন প্রজন্মও এ পেশায় যুক্ত হচ্ছে।
সাংবাদিকতা হোক সততার প্রতিচ্ছবি
একজন সংবাদসেবী কিংবা প্রাক্তন সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করা যায়—সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং সমাজের দর্পণ।
যারা কলম হাতে সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে লিখেন এবং সত্য প্রকাশে নির্ভীক থাকেন, তাঁদের দায়িত্ব অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।
কিন্তু সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতা, ব্যক্তিস্বার্থে কলমের ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা কিংবা বিভেদ-বিভাজনের রাজনীতি কোনোভাবেই এ মহান পেশার মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রেসক্লাব কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান—যেখানে সাংবাদিকদের রক্ত, ঘাম, শ্রম ও স্বপ্ন জড়িয়ে আছে।
তাই ব্যক্তিগত মতানৈক্যকে পেছনে রেখে পেশাগত সততা, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের ভিত্তিতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
কেন ঐক্য, বস্তুনিষ্ঠতা ও দায়িত্বশীলতা জরুরি
বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ইতিহাস রক্ষা, সত্য প্রকাশ, সামাজিক বিবেক জাগ্রত করা এবং জনমত গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে গিয়ে মফস্বল সাংবাদিকদের অনেক সময় শারীরিক নিপীড়ন, অপপ্রচার, ষড়যন্ত্র, হামলা-মামলা, চাকরি হারানো এবং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।
তবুও সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো সত্য ও ঐক্য।
সাংবাদিকতা বিভাজনের জায়গা নয়; এটি মেধা, মনন ও সত্য প্রকাশের শিল্পভিত্তিক চর্চা। সংবাদমাধ্যমকে বিভ্রান্তি ছড়ানো বা ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা সাংবাদিকতার প্রতি অবিচার।
সাংবাদিকের কাজ কোনো রাজনৈতিক দালালি বা তোষামোদ নয়। কলমের শাণিত শক্তিতে সমাজকে জাগিয়ে তোলাই তাঁর দায়িত্ব।
প্রিন্ট কিংবা ইলেকট্রনিক—যেকোনো গণমাধ্যমেই বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিস্বার্থে বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ পরিবেশন কাম্য নয়।
সাংবাদিকতা হবে মুক্ত বিবেকের প্রতিচ্ছবি। শব্দ দিয়ে গড়া এই পেশা যেন সমাজের দর্পণ হয়ে ওঠে—এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।
উপসংহার
বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব শুধু একটি সংগঠন নয়; এটি একটি চিন্তাশীল সংবাদ-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।
১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতা, সংবাদচর্চা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং অসংখ্য সংবাদকর্মীর শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠায় এ প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে।
আগামীর বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব হোক আরও ঐক্যবদ্ধ, আরও পেশাদার, আরও দায়িত্বশীল এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আরও শক্তিশালী—এটাই প্রত্যাশা।
আমাদের বার্তা
“প্রেসক্লাবকে ঘিরে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু মনভেদ থাকা উচিত নয়।”
“বিভ্রান্তি নয়, ঐক্যের আলোয় বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব হোক সকলের গৌরবের ঠিকানা।”
বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব তার ইতিহাস, সংগ্রাম ও সাফল্যের মধ্য দিয়ে যে ঐতিহ্য অর্জন করেছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও সমৃদ্ধভাবে তুলে ধরাই হোক আমাদের দায়িত্ব।
সত্যের পক্ষে, সমাজের স্বার্থে এবং ইতিহাসের গৌরবে—বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব এগিয়ে যাক।
এ প্রত্যাশা সবার।
